সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পালিয়ে যাওয়া: একনায়কতান্ত্রিক শাসনের সমাপ্তি
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে করে রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে পালিয়েছেন। রোববার (৮ ডিসেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনীর দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি দামেস্ক থেকে কোথায় গেছেন, তা জানা যায়নি।
একজন শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের অধীনস্থদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট আসাদের ২৪ বছরের একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ হয়েছে।
বিদ্রোহী বাহিনী ঘোষণা করেছে যে, রাজধানী দামেস্ক এখন ‘আসাদ মুক্ত’। তারা শহরে প্রবেশ করেছে এবং সেখানে সেনাবাহিনীর কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। সেডনায়া এলাকায় অবস্থিত একটি কারাগার থেকে অসংখ্য বন্দিকে মুক্ত করেছে বিদ্রোহীরা।
তারা আরও জানায়, সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ হোমস শহর দখল করার পর বিদ্রোহীরা উদযাপন করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো নাতাশা হল বলেছেন, "এটি আসাদের পরিবারের ৫৪ বছরের শাসনের অবসান হতে চলেছে। আমরা হয়তো সিরিয়ায় একনায়কতন্ত্রের শেষ মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছি।"
নাতাশা আরও বলেন, "এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি কারণে। আসাদের প্রধান মিত্র ইরান ও রাশিয়া বৈশ্বিক চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, এবং অনেকে উদ্বাস্তু শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। মানুষ অবশেষে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।"
আসাদ পরিবারের শাসনের ইতিহাস
১৯৭০ সালে হাফেজ আল-আসাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেন। বাথ পার্টির নেতা হিসেবে তার শক্তিশালী সামরিক অবস্থানের কারণে তিনি শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন।
১৯৮২ সালে হামা শহরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিদ্রোহ দমনে চালানো গণহত্যায় ১০ থেকে ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়, যা তার শাসনের এক অন্ধকার অধ্যায়।
হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর ২০০০ সালে তার পুত্র বাশার আল আসাদ ক্ষমতায় আসেন। পেশায় একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ বাশার প্রথমে একজন সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও, পরবর্তীতে পিতার মতোই কঠোর শাসননীতি গ্রহণ করেন।
২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাব সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে, বাশার আল আসাদ সংলাপের পরিবর্তে কঠোর দমননীতি চালু করেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে সামরিক অভিযান, বোমাবর্ষণ এবং রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার দেশটিকে ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
আজকের ঘটনাপ্রবাহ সম্ভবত সেই দীর্ঘ শাসনামলের পরিসমাপ্তি হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।

No comments:
Post a Comment